ডব্লিউজিসির প্রতিবেদন

বার্ষিক স্বর্ণ চোরাচালান ১২০ বিলিয়ন ডলার, বৈশ্বিক সংকটের আশঙ্কা

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এর উৎস খুঁজে বের করা। কারণ স্বর্ণ একবার গলিয়ে বার বা পিণ্ডে রূপান্তর করা হলে রাসায়নিকভাবে এর উৎস আর শনাক্ত করা যায় না। অর্থাৎ, ধাতুটি বিশ্বের কোন খনি থেকে এসেছে তা আড়াল করা বেশ সহজ। এ সুযোগটিকেই পুরোদমে কাজে লাগাচ্ছে আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারকারী ও বিভিন্ন অপরাধী চক্র।

বিশ্বজুড়ে স্বর্ণ চোরাচালান এক ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে বছরে অবৈধ স্বর্ণের আন্তর্জাতিক বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি (১২০ বিলিয়ন) ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ অবৈধ তৎপরতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশে সহিংস যুদ্ধ, অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং অর্থ পাচারের মতো অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট শীর্ষ নির্বাহী ও বিশ্ব নেতারা। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

সম্প্রতি লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলবিএমএ) এবং ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (ডব্লিউজিসি) যৌথ উদ্যোগে একটি টেকসই ও দায়িত্বশীল উৎস বিষয়ক সম্মেলন আয়োজিতহয়। সেখানে বিশ্ব নেতারা ও খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়টি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা জানান, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবৈধ অর্থ পাচারের জন্য চোরাচালানের স্বর্ণকে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দাম কিছুটা কমলেও, উচ্চ মূল্যের কারণে স্বর্ণ এখন বেশ আকর্ষণীয় ও লাভজনক পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। খাতের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, এই চোরাচালানের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ সুদান ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআরসি) মতো যুদ্ধবিদ্ধস্ত আফ্রিকান দেশগুলোতে চলমান সহিংস সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।

ডব্লিউজিসির প্রধান নির্বাহী ডেভিড টেইট বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় সংকট। অবৈধ স্বর্ণ উত্তোলনের সঙ্গে সহিংস সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেয়া এবং অবৈধ অর্থায়নের বিষয়টি এখন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।’

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এর উৎস খুঁজে বের করা। কারণ স্বর্ণ একবার গলিয়ে বার বা পিণ্ডে রূপান্তর করা হলে রাসায়নিকভাবে এর উৎস আর শনাক্ত করা যায় না। অর্থাৎ, ধাতুটি বিশ্বের কোন খনি থেকে এসেছে তা আড়াল করা বেশ সহজ। এ সুযোগটিকেই পুরোদমে কাজে লাগাচ্ছে আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারকারী ও বিভিন্ন অপরাধী চক্র। এলবিএমএর প্রধান নির্বাহী রুথ ক্রওয়েল বলেন, ‘উচ্চ মূল্যের কারণে এ অবৈধ প্রবাহ বন্ধ করা এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ চোরাচালানের সিংহভাগ স্বর্ণই আসে ক্ষুদ্র ও ঐতিহ্যগত প্রান্তিক খনি শ্রমিকদের (এএসএম) কাছ থেকে। পুরো বিশ্বের মোট উৎপাদিত স্বর্ণের পাঁচ ভাগের এক ভাগ (২০ শতাংশ) এই ক্ষুদ্র খনিগুলো থেকে এলেও, তারা মূল ধারার বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত বাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কঠোর অডিট বা নিরীক্ষা এবং দায়িত্বশীল উৎস নীতিমালার কারণে প্রান্তিক খনির স্বর্ণ বৈধ বাজারে ঢুকতে পারছে না। ফলে এর ৯৯ শতাংশ স্বর্ণই সরাসরি চলে যাচ্ছে অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ সরবরাহ লাইনে, যা খুব সহজেই চোরাচালানকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

এ সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে। এর মধ্যে বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষ মেটাল ডিটেক্টর বসানো এবং স্বর্ণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে কঠোর উৎস নীতিমালার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ভেনিজুয়েলার অবৈধ স্বর্ণের খনিগুলোর ওপর একটি বিশেষ তদন্ত শুরুর প্রস্তাবও করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে এরই মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় বিল উত্থাপন করা হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাজ্যের উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি জানিয়েছেন, ব্রিটেন স্বর্ণ চোরাচালান রোধে আরো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বিলিয়ন ডলারের চোরাচালান বাণিজ্য বন্ধ করতে হলে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

আরও